First time in Bengali

একজীবনের জ্যোৎস্না
এক দিন আমার স্বপ্নে আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার সব।
গত পরশু আটলান্টায় ছিল অনুষ্ঠান। নিউ জার্সি থেকে এক রাতের জন্য পৌঁছেছি সেখানে, কার্যত ঝটিকা সফর। ঋচা’র সঙ্গে পরিচয় ফেসবুকেই, তাঁরই উদ্যোগে আটলান্টায় শুরু হচ্ছে কবিতা উতসব। আর সেই উৎসবের সাক্ষী থাকার জন্যই আমার হাজিরা। আছে বহুজনের কবিতাপাঠ ও আবৃত্তি, গান আর শ্রুতিনাটকও বাদ নেই। শ্রোতা হিসেবে থাকতে পারলেই হতো বেশ, কিন্তু অনুষ্ঠানের শেষে একবার মঞ্চে উঠতে হবে আমাকেও, এমনই ছিল শর্ত। সেই সংকোচ মনে নিয়েই গোড়া থেকে বসে উপভোগ করছিলাম বাকিদের উপস্থাপনা।
ভারী আন্তরিক আর উদ্যোগী আয়োজন, বলতেই হবে। গান আর আবৃত্তিতে এমনকী খুদেরাও সামিল খুশিমনে। আর, মঞ্চের একপাশে সামিল একখানি কি-বোর্ড, আর বাঁয়া-তবলা। বহু বছর ধরে মার্কিন মুলুকের বাসিন্দা হয়েও কত কত মানুষ নিজেদের শখ আর নেশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন, এসব অনুষ্ঠানে না এলে তা টের পাওয়া যায় না। সকলের সঙ্গেই হাসিমুখে তবলা সঙ্গত করে চলেছেন রানা, কি-বোর্ডে গানেদের মুড়ে রাখছেন পিয়া।
শেষমেশ আমাকেও গাইতে হল একখানা গান, আর এই দু’জন দু’দিক দিয়ে কাঁচা সেই পরিবেশনাকে দিব্যি আগলে রাখলেন। এ ধরণের উষ্ণ অনুষ্ঠান শেষে যেমনটা হয়, সকলে ঘিরে নিলেন আমাকে, আলাপ জমাবেন বলে। আর আমিও সেই তোড়ে নতুন মুখ জুড়ে নিতে লাগলাম জীবনে। এমন সময়ে দেখি, একপাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছেন এতক্ষণ ধরে কি-বোর্ড বাজানো মানুষটি। পিয়া। চোখে চোখ পড়তেই এগিয়ে এসে বললেন, ‘আপনার হয়তো মনে নেই, আমি দিদি’র কাছে গান শিখতাম’। চেহারা দেখে তাঁকে ঠাহর করতে না পারলেও, বাক্যিখানা ভারী চেনা আমার। ছোটবেলা থেকে মা’কে ‘দিদি’ হিসেবেই জেনে এসেছি। বয়স্ক থেকে মাঝবয়সী, তরুণ-তরুণী থেকে কচিকাঁচা, সকলেই গান শিখতে এসে মা’কে ‘দিদি’ সম্বোধন করতেন। দু’একজন অবিশ্যি ‘গুরু মা’-ও বলতেন, কিন্তু ‘দিদি’ ডাকাটাই ছিল চল। মায়ের ছাত্রছাত্রীরা তখন সংখ্যায় এত বেশি ছিলেন যে, কয়েকজন ছাড়া আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ ছিল না কারওই। তাছাড়া, আমি থাকতাম আমার ছোট্ট ঘরে আলসেমিতে ব্যস্ত, বাইরের জমজমাট গানঘর থেকে দিনরাত তানপুরার আওয়াজ শোনা, আর রাগকে আহির ভৈরব থেকে কঁওসি কানাড়ায় গড়িয়ে যেতে দেখাই ছিল আমার প্রিয় সময় যাপন। এই পিয়া-ও নিশ্চয়ই তাঁদেরই মধ্যে একজন, যার গলা আমি ঘর থেকে শুনেছি বহুবার, কিন্তু মুখোমুখি দেখা হয়নি।
পরে অবশ্য দেশের বাইরে বহু জায়গায় গিয়ে মায়ের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেছে এভাবেই, যাদের কাছে আমার প্রথম পরিচয়, ‘দিদির ছেলে’ হিসেবে। পিয়াও তেমনই একজন মানুষ। কিন্তু কেবল সে-কথা লেখার জন্য লিখছি, এমন নয়। আলাপ-পর্ব সেরে পিয়া বললেন, ‘একটা কথা বলি? আপনি যখন কলেজের পরীক্ষা না দিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, আমি তখন দিদি’র কাছে গান শিখি’। বিলক্ষণ মনে পড়ে গেল সময়টা। ভূগোলে’র পার্ট টু, প্র্যাকটিকাল। পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি বলে হাওড়া থেকে ইস্পাত এক্সপ্রেস ধরে সোওজা জামশেদপুর, ছোট মাসি আর মেসো’র আস্তানায়। স্বাভাবিকভাবেই গড়িয়ার বাড়িতে বাবা-মা’র মাথায় মধ্যবিত্ত আকাশ ভেঙে পড়েছিল, আমিও মাস চারেক বাড়ি ফিরিনি তারপর। এ কাহিনি বহু জায়গায় বলেছি, অনেকেরই জানা, তবু পিয়া’র মুখে শুনে একবার সেই সময়ের ঝলক চোখের সামনে দেখতে পেলাম যেন।
আমি এক লহমায় জামশেদপুর হয়ে আবার আটলান্টায় ফেরত আসতেই পিয়া বললেন, ‘তখন গানের ক্লাসে দিদি রোজ আক্ষেপ করতেন আমাদের কাছে। বলতেন, একটাই ছেলে, একটু’র জন্য গ্র্যাজুয়েশনের পরীক্ষায় বসল না। ওর ভবিষ্যৎ যে কী হবে… কী যে করবে, কে জানে!’ এ সময়টায় আমি ছিলাম না মা-বাবা’র সামনে, তবু আন্দাজ করতে পারি, কতখানি উদ্বেগ, আশংকা আর পীড়া দিয়েছি দু’জন মানুষকে। যদিও এই ৪৪-এ পৌঁছেও আমি ঠিক নিশ্চিত নই যে আমি কী করব, আমার ভবিষ্যৎ ঠিক কী হবে, আমি আজও জানি না। পিয়াকে আর মুখোমুখি বললাম না যে, মা এখনও, আমার এই ৪৪ বছর বয়সেও, তেমন তেমন দুঃখ করার লোক পেলে বলেন, ‘কীরকম ছেলে ভাবুন একবার, গ্র্যাজুয়েশনটা একটু’র জন্যে শেষ করল না’। মাঝবয়সী আমি আর প্রৌঢ়া মায়ের মাঝামাঝি অনপনেয় এক আক্ষেপের মতো আমার ব্যর্থ স্নাতকতা আটকে রয়েছে, তাকে আর সারানোর জায়গা নেই।
পিয়া আমার কাছ থেকে মায়ের ফোন নম্বর চেয়ে নিলেন, অনেকদিন পর একবার কথা বলবার তাগিদে। আর একখানা ভারী সুন্দর হাতব্যাগ আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘একটা ছোট্ট উপহার, দিদি’র জন্য। দিদিকে বলবেন, পিয়া দিয়েছে’। এ ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় কেটে গিয়েছে, আমি রাত জেগে উড়ান বদল করে ফিরে এসেছি নিউ জার্সি। আর এখন যখন এই লেখা লিখছি ঘরের মধ্যে বসে, বাইরের বাগান, ঘরবাড়ি, রাস্তা সব আলৌকিক জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। ঘন গাছাপালাদের মাথায় রুপোলি পাকাচুল সাজিয়ে আকাশে টাঙানো আছে মস্ত এক গোল চাঁদ, যেন রাত সমস্ত পোশাক ছাড়ার পর কেবল টিপ খুলে রাখতে ভুলে গিয়েছে। মনে পড়ে গেল, এই চাঁদ তো গুরুপূর্ণিমা’র চাঁদ, এই আশ্চর্য জ্যোৎস্না তো গুরুপূর্ণিমা’র নিজস্ব লণ্ঠন। মনে পড়ে গেল এও, এমন দিনে বাড়িতে কত মানুষজনকে জড়ো হতে দেখেছি মা’র কাছে। বাবা’ও ছুটি নিয়ে বাড়ির ভিড় সামলাতে ব্যস্ত হতেন ভারী। ছাত্রছাত্রীরা প্রণাম জানাতে আসতেন, অনেকে সেদিন নতুন বন্দিশ গলায় তুলে, মায়ের হাত থেকে নিজেদের কব্জিতে সুতো বেঁধে দীক্ষা নিতেন সুরের, গানের। কখনও বিকেল পড়ে এলে আমরা যেতাম মামাবাড়িতে। নিজের বাবাকে হারানোর পর দাদাকেই মা গুরু হিসেবে মেনেছে বরাবর, তাঁকেও তো প্রণাম করা চাই। সে-বাড়িতেও একদফা গানবাজনা হতো জোর। অনেকগুলো বছর গড়িয়ে গেছে সময়ের ঢাল বেয়ে, মা ইদানীং গানের ঘরে ঢোকে না বিশেষ। গুরুপূর্ণিমায় দু’একজন পুরনো ছাত্রছাত্রী আসেন, কেউ কেউ ফোন করেন, এই অবধি। আগের সেই জৌলুস আর নেই।
এ বছর আমি কয়েক হাজার মাইল দূরে, দূর্বাও নিজের কাজে ব্যস্ত। জানি না, গুরুপূর্ণিমা’র প্রণাম জানাতে কেউ এসেছেন কিনা, কেউ ফোনে কথা বলেছেন কিনা এই দিনটিকে মনে রেখে। নইলে নিজের ঘরে ফেডেরার-এর পরাজয়ের দুঃখ নিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকা আমার মা’র হয়তো মনেও নেই, আজ কোন তিথির চাঁদ উঠেছে আকাশে। আর এ লেখা যখন লিখছি, চাঁদ তখন আমার দেশের আকাশ থেকে সরতে সরতে পৌঁছে গেছে এ-দেশের চাঁদোয়ায়, মা’র ঘরে বেলা’র রোদ বা মেঘ ঢুকে আসছে নির্ঘাত। জ্যোৎস্না তার চাদর নিয়ে এভাবেই সরে আসে, ঘর থেকে, দেশ থেকে, বয়স থেকে…। পড়ে থাকে কেবল তার দাগ, কখনও হাতের পাতায়, কখনও ভাবনার আড়ালে। তবু, এই লেখা শেষ করতে করতে আমি দেখতে পাচ্ছি, পিয়া’র উপহার দেওয়া ওই গাঢ় নীলচে হাতব্যাগের মধ্যে বন্দি হয়ে আছে একফালি জ্যোৎস্না, গুরুপূর্ণিমা’র। ওইটুকু ব্যাগের মধ্যে দিব্যি ধরে গেছে চাঁদের এক-আকাশ ব্যয়, আমার মায়ের একজীবনের সঞ্চয়… যা আমার সঙ্গে ক’দিন পর পেরিয়ে যাবে অতলান্তিক মহাসাগর, পৌঁছে যাবে মায়ের ছোট্ট ঘরে। সারা জীবন যার গান শিখিয়ে বয়ে গিয়েছে, তেমন একজন গুরু’র জন্য এর চেয়ে সার্থক পূর্ণিমা আর কী-ই বা হতে পারে? আর কেউ না বুঝুক, আকাশ পেরিয়ে আসা রুপোলি চাঁদ তার মূল্য বোঝে। তাকেই তো খরচ করতে হয়েছে, একজীবনের জ্যোৎস্না…

A live-in life

The ceremony was held in Atlanta last evening. New Jersey has arrived for one night, there is a really quick tour. Introducing Rija with Facebook, her initiative started in Atlanta as the Poetry Festival. And to be a witness to that festival, my presence There are many poems and memorabilia, songs and scriptures in addition to the songs. It would have been enough to stay as an audience, but at the end of the ceremony I would have to go to the stage once, the condition was such. I was enjoying it from the outset with the feeling of sympathy and the rest of the presentation.

3 Likes

সুন্দর।। :heart:

1 Like

ধন্যবাদ

1 Like